আমৃত্যু মফস্বলে বাস। উঠে এসেছেন মফস্বলের পশ্চাৎপদ অজ গ্রাম থেকে। মনের ভিতর কে যে জ্ঞানতৃষ্ণার দীপশিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন! সেই তৃষ্ণাই প্রবল হয়ে ওঠে। সেই বাল্যকাল থেকেই একই পিপাসা তাঁকে তাড়িত করেছে জীবনভর, মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। পুরোটা জীবন তাঁর একই পথে নিরন্তর সংগ্রাম—তাঁর বৃত্তের ভিতরে থেকেই, রাজধানীর বাইরে মফস্বলে থেকেই। বড় জোর এসেছেন ময়মনসিংহ শহর পর্যন্ত, পেশাগত প্রয়োজনে বসবাস করেছেন; পেশার মেয়াদ শেষে ফিরে গিয়েছেন নেত্রকোণায়—নিজ জেলায়। রাজধানীর বাইরে থেকেও তাঁর বিকীর্ণ আলোকশিখায় দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে হয়ে উঠেছেন মহীয়ান, সর্বজন শ্রদ্ধেয়।
তিনি তাঁর জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন অধ্যয়ন। অধ্যাবসায় নিবিষ্ট ছিলেন এই ধ্যান-জ্ঞানেই। নিযুক্ত ছিলেন নিজের পাঠে এবং পাঠ বিতরণে। পুরো জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছেন এই কর্মেই —গভীর মগ্নতায়। দর্শনগত চিন্তা-ভাবনায় মার্কসবাদে প্রভাবিত ছিলেন, যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশের কম্যুনিষ্ট পার্টির সাথে। সেখানেও পরিচালনা করেছেন পাঠচক্র।
ময়মনসিংহ শহরে বসবাসকালে তিনি সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যুক্ত ছিলেন ওতোপ্রেতো ভাবে। অনুষ্ঠান সভা সমাবেশে তাঁর ভাব-গাম্ভির্যপূর্ণ দরাজ কণ্ঠস্বর উচ্চকিত থাকত; গাঙ্গিনার পাড় মোড়ে প্রেসক্লাবে সান্ধ্যাকালীন আড্ডায় অধ্যাপক যতীন সরকার, অধ্যাপক গোলাম সামদানী কোরায়শী, অধ্যাপক রিয়াজউদ্দীন আহমদের নিয়মিত উপস্থিতি অপরিহার্য ছিল। তাঁর অট্টহাসিতে মুখরিত থাকত ময়মনসিংহ প্রেসক্লাব অঙ্গন।
পোষাক-আশাক আচার-আচরণে তিনি ছিলেন নিখাদ বাঙালি—ধূতি-পাঞ্জাবি ছাড়া অন্য পোষাকে তাঁকে কমই দেখা যেতো।
সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তরুণদের প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ আকর্ষণ। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চায় তরুণদেরকে তিনি স্নেহ ও আনুকূল্য দিয়েছেন, তাঁর দ্বার ছিল অবারিত, উদ্দীপনামূলক। প্রতিভাবান তরুণদেরকে প্রশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে তিনি কোনো তাত্বিকতার একদর্শিতা, মতামতের ভিন্নতা, সংকীর্ণ দলীয় না গোষ্ঠীগত একদেশদর্শিতায় প্রভাবিত হতেন না।
ভিন্ন চিন্তা-ভাবনা পোষণ করেও আমরা তাঁর প্রবল স্নেহে সিক্ত হয়েছি, অনেক ক্ষেত্রেই পেয়েছি প্রশ্রয়, এমনকি সৃজনশীল কর্মতৎপরতায় সমর্থনও। এজন্যই তাঁর স্নেহছায়ায় আমাদের কৈশোর বিকশিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
অধ্যাপক যতীন সরকারের সঙ্গেমধুময় স্মৃতি অনেক। এমন কিছু স্মৃতির ওপর আলোকপাত করা হলে এই মহান ব্যক্তিত্বের সাদাসিধে জীবনাচার, অথচ হৃদয়ের মহত্ব খানিকটা বোঝা যাবে।
অধ্যাপক যতীন সরকারের সঙ্গেআমার যখন প্রথম দেখা সেসময় তাঁকে চিনতাম না, জানতাম না, নামও শুনি নাই। আমার কৈশোরবেলায়। ১৯৭০ সালের দিকে। ময়মনসিংহ তখন জেলা। জেলাব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা। তারই এক পর্যায়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আয়োজনটা জেলা সদর ময়মনসিংহ শহরেই। আমি জামালপুরের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে এসেছি। যতদূর মনে পড়ে শেরপুর থেকে এসেছেন শাহজাদী আঞ্জুমান আরা মুক্তি। প্রতিযোগিতার ভেন্যু তৎকালীন পাকিস্তান কাউন্সিলে, পরে যেটা বাংলাদেশ পরিষদে রূপান্তরিত হয়। সে-সময় পাকিস্তান কাউন্সিলের ময়মনসিংহ শাখার প্রধান ছিলেন ফখরুজ্জামান চৌধুরী, প্রখ্যাত অভিনেত্রী দিলারা জামানের স্বামী—তিনি তখন ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজে কর্মরত ছিলেন।
বিতর্কের এই প্রতিযোগিতায় বিচারকদের মধ্যে ছিলেন সম্ভবত অধ্যাপক গোলাম সামদানী কোরায়শী, অধ্যাপক যতীন সরকার। তাঁদের কাউকেই চিনি না। আবৃত্তিশিল্পী অধ্যাপক তারিক সালাহউদ্দীন মাহমুদও ছিলেন।
তারিক ভাইয়ের কথা মনে রয়ে গিয়েছে তাঁর অদ্ভুত আচরণের কারণে। অনুষ্ঠান শেষে মঞ্চে বিচারকের আসন থেকে নেমে এসে আমার মতো এক পিচ্চি তার্কিককে সাক্ষাৎ দিলেন। প্রশংসা করলেন তরুণ তার্কিকের যুক্তিজাল বিস্তারের কায়দাকে। তিনি কথা বলছিলেন, একটা একটা করে শব্দ উচ্চারণ করছিলেন, বলতে বলতে দুই পা পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। আবার নতুন কথা বলার শুরুতে পায়ে পায়ে এগিয়ে আসছিলেন। বলতে বলতেই আবার পিছিয়ে যাচ্ছিলেন। পরেও তাঁর সঙ্গেযখন ঘনিষ্টতা হয় সে সময়ও লক্ষ করেছি, ডাকাডাকি করতে আমাদের আবাসস্থলে এলে বদ্ধ দরজার কড়া নেড়েই দুই পা পিছিয়ে যেতেন।
সেই প্রতিযোগিতা থেকে ফিরে আসার পর যেমন কারো নাম জানা ছিল না, তারিক ভাই ছাড়া আর কারো চেহারাও মনে ছিল না। বহুকাল পর ময়মমসিংহে বীক্ষণের এক অনুষ্ঠানে অধ্যাপক যতীন সরকার নিজেই সেদিনের কথা উল্লেখ করেন। আমার বিস্ময়াভিভূত আবেগ: তিনি কী ভাবে শনাক্ত করলেন আমার মতো অর্বাচীন এক কিশোরকে এবং মনে রাখলেন আমার প্রায় তিন দশক কাল ধরে, যা আমার নিজের স্মৃতিতেই ঝাপসা হয়ে এসেছে! এতো শতবার তাঁর সঙ্গেদেখা, একসঙ্গেওঠাবসা, বাদানুবাদ, এতো সবের পরও তিনি এই ঘটনার উল্লেখ এর আগে কখনো করেন নাই।
মুখে মুখে তর্ক কখনো মতান্তরের পরও ময়মনসিংহের বিভিন্ন মঞ্চে—বাংলাদেশ পরিষদে, প্রেসক্লাবে, টাউন হলে, মুসলিম ইনস্টিটিউটে একসঙ্গেকতোবার যে উঠেছি, তার হিসাব নাই।
একবার কোনো এক জার্নালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ নিয়ে ময়মনসিংহ শহরের কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও বোদ্ধা পাঠকদের নিয়ে ঘরোয়া ভাবে প্রবন্ধ পাঠ ও আলোচনার আয়োজন করা হয়। সে সময়কার শহর মাতাল করা আমরা কয়েকজন তরুণও সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম। তাঁর আগ্রহেই আমাকেও আলোচনা করতে হয়। আমার আলোচনা সাদারণ প্রশংসাসূচক ছিল, তাঁর এটা পছন্দ হয়নি। তিনি তাঁর নাখোশ অবলীলায় ব্যক্ত করেন; অন্যরা যে এমন গৎবাঁধা আলোচনা করবে তা তাঁর জানাই ছিল, কিন্তু আমাদের কাছে তাঁর প্রত্যাশা ছিল অনেক গভীর —চুলচেরা বিশ্লেষণ ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা। আমাদের প্রতি এমন গুরুত্ব দান ও প্রত্যাশা ছিল আজীবন।
অধ্যাপক যতীন সরকারের সঙ্গেআমার পদবীর সামঞ্জস্য থাকায় কারো কারো মধ্যে বিভ্রান্তি ও কৌতুহল দেখা দিত যে আমাদের ভাইয়ের সম্পর্ক রয়েছে কিনা। ব্যাপারটা তিনি খুব উপভোগ করতেন। মাঝে মাঝেই সকৌতুকে আমাকে প্রশ্ন করতেন, আমি তাঁর ছোট ভাই এটা কেউ জানতে চেয়েছেন কিনা।
স্বনামখ্যাত সংস্কৃতি সংগঠক মনু ইসলাম তাঁর সেন্টার ফর বাংলাদেশ কালচার-এর উদ্যোগে অমর কথাশিল্পী হাসান আজওজুল হককে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এ উপলক্ষে এক স্মারক প্রকাশের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়। এই স্মারকের জন্য অধ্যাপক যতীন সরকারের কাছে একটি প্রবন্ধ প্রত্যাশা করা হলে তিনি সানন্দে সম্মত হন। কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হকের দ্বিধা ছিল, তাঁর ওপর আলোচনা লিখতে রাজী হবেন কিনা। অধ্যাপক যতীন সরকারের সম্মতি তাঁকেও আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ করে। হাসান আজিজুল হক মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রবন্ধটি গুরুত্বপূর্ণ।
অধ্যাপক যতীন সরকার আজীবন মফস্বলবাসী। তাঁর কর্মতৎপরতা, লেখালেখি, সাংস্কৃতি কার্যক্রম সবই ওখান থেকেই। ময়নসিংহে অবস্থান করেও দেশজোড়া তাঁর খ্যাতি ও সম্মান। কিন্তু তাঁকে ও তাঁর সৃষ্টি কার্যক্রমকে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যায়িত ও সংবর্ধিত করার উদ্যোগ ছিল না। এটি মফস্বলবাসী প্রতিভাবান সৃজনশীল বুদ্ধিজীবীদের দুর্ভাগ্য। রাজধানীর সদ্য কোনো তরুণ কবিও মফস্বলের যে কোন অনুষ্ঠানে শুধু আমন্ত্রিতই হননা, সংবর্ধিতও হন।
এই প্রেক্ষাপটে বন্ধুবর শফিকুল ইসলাম তাঁদের সংগঠন আমরা সূর্যমুখীর উদ্যোগে জাতীয় যাদুঘরের এক মিলনায়তনে অধ্যাপক যতীন সরকারকে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই অনুষ্ঠানে বুদ্ধিবৃত্তিক সুধীজনের ঢল নেমেছিল, হল কানায় কানায় ভরে গিয়ে তাঁর প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিল।
প্রখ্যাত কথাশিল্পী ও সাংবাদিক কর্মজীবনের শুরুতে অধ্যাপক যতীন সরকারের সহকর্মী ছিলেন। ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজে। রাহাত খান সেখান থেকে পরে ঢাকায় জগন্নাথ কলেজে চলে আসেন, তারও পরে সাংবাদিকতায়, সে সময়কার বহুল প্রচারিত দৈনিক ইত্তেফাকে যোগদান করেন। অধ্যাপক যতীন সরকার ঢাকায় এলে রাহাত ভাই যতীন স্যারকে দুপুরে খাওয়ার দাওয়াত দেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের নিচ তলার কেন্টিনে। সঙ্গেআমি ও শফিকুল ইসলাম সেলিম। প্রেসক্লাবের নিচতালার কেন্টিনটা শুধুই ক্লাবের সদস্যদের জন্য। রাহাত ভাই ও আমি সদস্য। সেদিন কেন্টিন কর্তৃপক্ষ খানিকটা ঝামেলাতেই পড়ে গিয়েছিলেন। অতিথির সম্মানের কথা বিবেচনা করে ও ক্লাবের নিয়ম রক্ষা করে আমাদের ডাইনিং টেবিল পাতা হয় কেন্টিনের বারান্দায়।
বিড়ম্বনায় পড়তে হয় ঢাকা ক্লাবেও। অন্য আরেক দিন। এবার মেম্বারদের কেন্টিনে নয়, ক্লাবের গেস্ট কেন্টিনে। আমন্ত্রণ রাহাত খানেরই। অধ্যাপক যতীন সরকারের সম্মানে। সঙ্গে যথারীতি সেলিম ও আমি। ঢাকা ক্লাবের ড্রেসকোড শক্ত। অধ্যাপক যতীন সরকার আবার এ ব্যাপারে পুরোপুরি বাঙালিয়ানায়। পোষাক-আশাক নিয়ে ঝামেলা হলো না, গোল বাধলো পাদুকা নিয়ে যতীন সরকারের পায়ে নিখাদ চটি, অভিজাত ক্লাবে নিষিদ্ধ। ক্লাব কর্তৃপক্ষ অবশ্য ব্যবস্থা করেই রেখেছেন। ঢোকার দরজার পাশেই রেখে দেয়া হয়েছে কয়েক জোড়া জুতো আর বেল্টঅলা স্যান্ডেল। তিনি স্যান্ডেলই বেছে নিলেন—সেটাও আবার তাঁর পায়ের সাইজের তুলনায় খানিকটা ঢলঢলে। ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে আমার দিকে চোখ পাকিয়ে নললেন: এসব জায়গায় আমাকে আর কখনোই নিয়ে আসবে না।
