স্বপ্ন এখন লাশঘরে ॥ উমর ফারুক – অর্থবিত্ত

স্বপ্ন এখন লাশঘরে ॥ উমর ফারুক

কান্না করিস না মৌরি।
চল আমরা হাসপাতালে যাই।
মনটা ভালো নেই। তবু যেতে হবে। কারণ ওর পাশে তো কেউ নেই। এই শহরে আমরাই ওর আপনজন।
হ্যাঁ। হাসপাতালে তো যেতেই হবে। গভীর রাতে হাসপাতালে রেখে এসেছি। এখন পর্যন্ত খবর নিতে পারিনি। একটু পরে শাহনাজ আসার কথা। ও এলেই কলেজের খবরটা শুনে বের হবো।
আচ্ছা কেয়া তুই বল ভালোবাসা কি পাপ? যে ভালোবাসার জন্য লিজাকে এমন করে খেসারত দিতে হচ্ছে।
লিজার বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুরে গ্রামে। এক প্রত্যন্ত গ্রাম। ব্রহ্মপুত্র নদের কয়েক দফা ভাঙনে সর্বস্বান্ত ওই গ্রামের প্রত্যেক মানুষ। এই গ্রামে খুবই গরিব ঘরের কন্যা সে। তিন ভাই বোনের মধ্যে লিজা সবার বড়। ঢাকা শহরে রিকশা চালিয়ে সংসার চালান লিজার বাবা রমজান আলী। নিজ উপজেলা কিংবা জেলাতে রিকশা চালালে লিজাকে অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়। সহপাঠিরা লিজাকে রিকশাচালকের মেয়ে বলে হেয় করে। তাই লিজার অনুরোধে দুর শহরে রিকশা চালায় রমজান। ছোট বেলা থেকেই মেধাবী ছিল লিজা। জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি ও এইচ এসসি পাস করার কারণে উপজেলায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিজা নামটি বেশ আলোচিত। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংগঠন থেকে লিজা পায় কৃতি শিক্ষার্থী সংবর্ধনাও। অনেকটা গোবরে পদ্মফুল ফোটার মতো। তাই রমজান আলী রিকশার হ্যান্ডেলে হাত আর প্যাটেলে পা রেখে স্বপ্ন দেখে মেয়েকে নিয়ে। বড় মেয়ে লিজা একদিন অনেক বড় হবে। পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করবে। দেশসেবার পাশাপাশি ছোট ভাই-বোনদেরও প্রতিষ্ঠিত করবে। একদিন হয়তো আর রিকশা চালাতে হবে না তাকে। লিজা চাকরি করলে অফিস থেকে গাড়ি পাবে। সেই গাড়ি নিয়ে গ্রামে আসবে। সবাই বলবে দেখ রমজানের মেয়ে গাড়ি নিয়ে এসেছে। গর্বে বুক ভরে যাবে সেদিন। আর আমার মেয়ে লিজা তা পারবে। কেননা এ পর্যন্ত সব পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়েছে সে।

এইচএসসি পাসের পর উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য লিজা ভর্তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। প্রকৌশলী বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় স্থান পায়। কিন্তু ভর্তি হলেই তো আর পাসের সনদ হাতে চলে আসবে না। পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে। আর পড়া লেখা চালানোর এত খরচ জোগানো সম্ভব নয় তার রিকশা চালক বাবার। তাই ওই আকাশছোঁয়া স্বপ্নের সমাধি রচনা করে রংপুরে সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজে ইংরেজি বিভাগে ভর্তি পরীক্ষা দেয়। মেধাতালিকায় লিজার রোল চলে আসে। ভর্তি হয়ে নিয়মিত ক্লাস শুরু করে। বেগম রোকেয়া সরকারী কলেজে দু’টি ছাত্রী হোস্টেল। ছাত্রীর তুলনায় কলেজ হোস্টেলে সিট কম। তাই হোস্টেলের সিট পেতে লবিং তদবির করতে হয়। কিন্তু এ ধরনের সুপারিশ করার কেউ ছিল না লিজার। তাই প্রথম দিকে কলেজের পাশে মালিকানা ছাত্রী নিবাসে সিট নিতে হয় তাকে। কষ্টের জীবনে নেমে আসে আরও কষ্ট। পড়ালেখার খরচ চালাতে চালাতে হিমশিত খায় রিকশা চালক রমজান।

লিজার মা শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ। স্থানীয় ডাক্তার বলেছেন, এভাবে ওষধ খেলে হবে না। শহরে নিতে হবে। ভালো ডাক্তার দেখাতে হবে। পরীক্ষা-নীরিক্ষা করতে হবে। কেননা তার তোর লিভারের জটিল সমস্যা আছে। কিন্তু রমজান আলীর ইচ্ছা থাকলেও উপায় নেই। এত টাকা তার কাছে নেই। স্ত্রীর চিকিৎসা করাবে কেমনে? মেয়ে লেখাপড়ার খরচ দিতে হবে তো। শহরের বড়ো কলেজে পড়ছে তার মেয়ে লিজা।

এদিকে, মায়ের অসুস্থতার খরব পেয়ে গ্রামে ছুটে আসে লিজা। অসুস্থ মাকে জড়িয়ে কাঁদে। মেয়ের চোখের পানি মুছে দিতে দিতে মা বলে, এভাবে কাঁদিস না। আমার কিছু হবে না। তুই পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করবি। আর তোর চাকরির বেতনের টাকা দিয়ে আমাকে ভালো ডাক্তার দেখাবি। আমি সুস্থ হয়ে যাবো। পারবি না তুই? আমি জানি আমার মেয়ে পারবে। মায়ের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে লিজা। কয়েকদিন মায়ের সেবা করে আবার ক্যাম্পাসে চলে আসে সে।

এবার মাথায় ঢুকে পড়ালেখার পাশাপাশি আয় করার চিন্তা। রুমমেট মৌরির কাছে জানতে চায় কিভাবে আয় করা যায়। অন্তত নিজের পড়ালেখার খরচ হলেই হবে।
অনেক ভেবে মৌরি বলে, উপায় একটা আছে।
কী উপায়?
প্রাইভেট পড়াতে হবে। কিন্তু…
প্রাইভেট পড়াতে আমি পারবো। কিন্তু কী?
কিন্তুটা হচ্ছে, প্রাইভেট পাওয়াটা কঠিন হবে। তবুও দেখি আমার একটা বন্ধু আছে। তাকে বলে কোনো ব্যবস্থা করা যায় কি না?

আমার বন্ধু ইমরান। কারমাইকেল কলেজে মাস্টার্সে পড়ে। রংপুরের স্থানীয় বাসিন্দা। ওদের বাড়ি গাড়ি সবই আছে। এলাকার প্রভাবশালীও বটে। পরদিন তার সঙ্গে দেখা করে প্রাইভেটের কথা জানালো। ইমরানও প্রস্তাবটা লুফে নিয়ে প্রাইভেট খুঁজতে শুরু করলো। প্রাইভেটের আপডেট প্রতিদিন ফোনে জানায় ইমরান। কয়েকদিন পর একটা প্রাইভেট পড়ার সুযোগ পায় লিজা। ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী হওয়ায় প্রাইভেট পেতে বেশি সময় লাগেনি। সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী হৃদি। পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়ে। মেয়েটির বাবা পুলিশে চাকরি করেন। মেয়েটিকে তার বাসায় গিয়ে পড়াতে হয় । লিজার আনন্দের শেষ নেই। প্রতিদিন রুটিন করে হৃদিকে পড়াতে যায়। খুব যত্নসহকারে পড়ায়। নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে গিয়ে উপস্থিত হয়। আবার নির্ধারিত সময়ের পরেও কিছু সময় পড়ায়। কেননা, এই প্রাইভেটের বেতনের ওপর নির্ভর করে লিজার ভবিষ্যৎ পড়ালেখা। তাই কোনোকিছুর কমতি সে করতে নারাজ।
এদিকে, প্রাইভেট খুঁজে দেওয়ার কারণে প্রায় প্রতিদিন ফোনে ইমরানের সঙ্গে কথা হয় লিজার। কথা বলতে-বলতে এক পর্যায়ে ভালো বন্ধুত্ব হয় দুজনের মধ্যে। লিজাও কৃতজ্ঞতার জায়গা থেকে এ সর্ম্পকটা ধরে রাখে।

প্রাইভেট থেকে নিয়মিত বেতন পাওয়ায় পড়ালেখা চালিয়ে যায় লিজা। সময় গুছিয়ে নিয়ে প্রতিদিন দুটো প্রাইভেট পড়ায় সে। নিজের খরচ চালানোর পরও ছোট ভাই বোনের পড়ালেখার জন্য টাকা পাঠায়।

সময়ের ব্যস্ততার মাঝে ইমরান থেমে নেই। ফোনে কথা বলার ফাঁদে ফেলে আস্তে-আস্তে দেখা করা শুরু করে। একটা সময়ে রোজ দিনেই দেখা হয় তাদের। প্রায় বছর খানিক পাড়ি দেওয়ার পর লিজার মনে ভেতরে একটা আস্থার জায়গা করে নেয় ইমরান। ভালো লাগা থেকে শুরু হয় ভালোবাসা।

লিজা অনেকটা ভেবেই এ পথের পথিক হয়েছে। ইমরান ভালো ছেলে শহরের স্থানীয়। সে পাশে থাকলে অনেক সমস্যা থেকে রেহাই পাবে সে। পথে ঘাটে কত ছেলে প্রতিদিন উৎপাত করে। ইমরান থাকলে রাস্তায় ছেলেরা আর উৎপাত করার সাহস পায় না।

বন্ধু মৌরি ওদের দু জনের প্রেমের সম্পর্ক জেনেছে। মৌরিও বাধা দেয়নি। কারণ লিজার মতো একটি মেয়ে যদি ভালো ছেলে খুঁজে পায়, তাতে সমস্যা কী? উল্টো লিজার উপকার হবে। লেখাপড়ায় আর কোনো বেগ পেতে হবে না । জীবনে দুঃখ কষ্টের ঘানি অনেক টেনেছে। এভাবে যদি সুখের সন্ধান পায় তবে সেও ভালো।

ইমরান প্রতিদিন লিজাকে নিয়ে ঘুরতে যায়। কোনো দিন সুরভী উদ্যান, কোনোদিন চিকলীর বিল, শিরিন পার্ক, খেয়া পার্ক, চিড়িয়াখানা, তাজহাট জমিদার বাড়ী ও ভিন্নজগৎ। রংপুরে থাকলেও এর আগে এসব জায়গাগুলো ঘুরে দেখা হয়নি লিজার। প্রেম ভালোবাসার খুনসুটিতে আর হাতে হাত রেখে পথ চলতে চলতে কেটে যায় মাস বছর।

এভাবে জীবনের ঘোরাঘুরি শেষ হতে না হতেই সরকারি চাকরি হয় ইমরানে। খুশিতে আত্মহারা লিজা। যাকে নিয়ে ঘর বাঁধবে, সে এখন সরকারি চাকুরে। মনে কত ছন্দের আলপনা আঁকে। কিন্তু, বিধির বিধান বড়ই কঠিন। এ হাসি দীর্ঘ হলো না লিজার।

চাকরির ক মাস যেতে না যেতেই পাল্টে যেতে থাকে ইমরান। আগের মতো খোঁজ রাখে না লিজার। দেখা করে না আগের মতো। ফোন করেও নেয় না খবর। ব্যস্ততার অজুহাতে আড়াল করতে থাকে নিজেকে। কোনো কিছুতেই হিসাব মেলে না লিজার। অস্থির হয়ে ওঠে সে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দুজনের মধ্যে শারীরিক সর্ম্পক হয়েছে কয়েক মাস ধরে। অনার্স শেষ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিয়েছে লিজা। পরীক্ষার ফল প্রকাশ পেলেই বিয়ে পিঁড়িতে বসবে তারা। এমনটাই কথা ছিল দুজনের মধ্যে। কিন্তু ইমরানের এমন আচরণ মোটেও ভালো ঠেকছে না তার কাছে।

কী করবে ভেবে পাচ্ছে না লিজা।
মৌরির কাছে খুলে বলে সব কথা। কিভাবে কবে কখন তাদের শারীরিক সর্ম্পক হয়েছিল। এখন সে কী করবে। কোথায় যাবে। কার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে।
মৌরি আশ্বস্ত করে বলে, আপাতত ভেঙে পড়িস না। অপেক্ষা কর। তুই বিসিএস কোচিং চালিয়ে যা। কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যেতে পারে। প্রেম পিরিতির মধ্যে এসব মান-অভিমান থাকবে। এখন প্রায় রাতে ফোনে ঝগড়া হয় দুজনের মধ্যে। কিন্তু লিজাকে বিয়ে করতে রাজি হয় না। উল্টো দুজনের শারীরিক সম্পর্কের সময় মোবাইলে যে নগ্ন ছবি তুলেছিল, সেই ছবি ইন্টারনেটে ছেড়ে দেওয়ারও হুমকি দেয় ইমরান। কিন্তু ইমরানের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাস। সম্পর্কের টানাপড়েনে এসব হুমকি-ধামকি আসতেই পারে। তাই এসব আমলে না নিয়ে অস্থির জীবন কাটতে থাকে। আধার কেটে আলো আসার অপেক্ষায়।

সেদিন শুক্রবার। সকাল থেকে কাপড় ওয়াশ করেন লিজা। মনের ভেতর কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যাওয়ার চিত্র তার শরীরে ফুটে উঠেছে। হঠাৎ রুমে দৌড়ে আসে মৌরি। লিজাকে ধমক দিয়ে মৌরি বলে, ছেলে মানুষ কথা বললেই তার প্রেমে পড়তে হয় না। কাছে ডাকলে বিছানায় যাওয়া যায় না। ছেলেরা শুধু ভোগ করেই ক্ষান্ত হয় না। তারা আরও অনেক কিছু করতে পারে।
লিজা জানতে চায় কেন?
কী হয়েছে?
কিছু না হওয়ার তো বাকি নেই।
সর্বনাশ হয়ে গেছে রে লিজা। এই বলে হাতে থাকা মোবাইলটা সামনে ধরে। লিজা মোবাইলের মনিটরেও তাকিয়ে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এটা কী করে সম্ভব? ইমরান এ কাজ ক্যামনে করলো?
লিজার নগ্ন ছবিগুলো ফেসবুকে দিয়েছে। লিজার ফেসবুক বন্ধুদের এ ছবি ট্যাগও করেছে। লিজার বন্ধু তালিকায় তার স্কুল কলেজের শিক্ষকরাও আছেন।
মুহূর্তে যেন আকাশ ভেঙে পড়লো মাথায়। এই অশুভ ঝড় কিভাবে মোকাবিলা করবে লিজা? চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে পাথর হয়ে গেছে সে। এদিকে, রিকশাচালক বাবা, অসুস্থ মা। ছোট ভাই-বোনের স্বপ্নময় জীবন। চোখের সামনে জোনাক পোকা জ্বলতে থাকলো।

মেসের মধ্যে সকলের কাছ থেকে আস্তে আস্তে আলাদা হয় সে। রুমে একাই বসে থাকে। কোনো প্রাইভেট সে পড়েও না আবার পড়াতেও যায় না। স্বাভাবিক জীবন থেকে সরে আসে লিজা। পাল্টে যায় তার সাজানো পৃথিবী। গোসল নেই। খাওয়া নেই। ঘুম নেই। দুচোখ দিয়ে শুধু শ্রাবণের বারি ধারা ঝরে যায়। এভাবে চলে যায় কয়েকদিন। এ কয়েকদিনে পৃথিবী ছোট হয় তার কাছে। বেহিসাবি মন হঠাৎ করে অঙ্ক কষে। মিলিয়ে নেয় জীবনের হিসাব। গভীর রাতে আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়।

অস্পষ্ট শব্দে রাতে ঘুম ভেঙে যায় মৌরির। মনটা তার মোচড় দিয়ে ওঠে। তাই রুমের সুইচ অন করে দেয়। বৈদ্যুতিক আলোয় নিজের রুমটা ভালো করে দেখে নেয়। কিন্তু না তেমন কোনো আলামত চোখে পড়লো না। তাই আবার ঘুমানোর প্রস্তুতি নিয়ে বিছানার দিকে যায়। তার আগে বাথরুমে যেতে ধরে।

ক্ষণপরে থেমে-থেমে গোঙানির শব্দ কানে ভেসে আসে। বাথরুম না গিয়ে আস্তে-আস্তে লিজার রুমের দিকে যায় মৌরি। যতই এগিয়ে যায় ততই গোঙানির শব্দটা স্পষ্ট হয়। লাথি মারতেই খুলে যায় দরজা। ভেতরে ঢুকেই সুইচ অন করতেই দেখে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে লিজা। ওড়না পেছানো গলা। মুখ থেকে ফেনা বের হচ্ছে।

হাউ মাউ করে চিৎকার দেয় মৌরি। চিৎকার শুনে আশে পাশে রুম থেকে সকলেই ছুটে আসে। দ্রুত ফ্যান থেকে খুলে নিচে নামায় লিজাকে। এরপর কয়েকজন ধরে বের করে রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। রিকশা খোঁজে সবাই। কিছুক্ষণ পর একটি রিকশাযোগে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয় লিজাকে। ডিউটি ডাক্তার দেখে বলেন, এখনো মারা যায়নি। তবে তার অবস্থাও ভালো নয়। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হবে। রাতে তো আর তেমন কিছু করা যাচ্ছে না। সকালে টেস্টগুলো করতে হবে। এরপর প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বেডে ভর্তি করা হয় লিজাকে। বেডে নেওয়ার পর একে-একে সবাই চলে যায় মেসে।

পরদিন সকালে মৌরি চোখের পানি মুচছে আর আর কেয়া বলছে, মনটা ভালো লাগছে না। এমন সময় রুমে আসে শাহনাজ। সে জানায়,অর্নাস ফাইনালের রেজাল্ট হবে আজ। মৌরি আরও কেঁদে ওঠে। লিজার আজ রেজাল্ট হবে। অথচ কোন বিপদে সে এখন জীবন মৃত্যুর মাঝে। চল আমরা কলেজে যাই। কলেজে রেজাল্ট নিয়ে হাসপাতালে যাবো।

টেবিলের ড্রয়ার থেকে লিজার রোল নম্বর বের করে নেয় মৌরি। কেয়াকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে যায়। কলেজের নোটিশ বোর্ডে নিজের রোল খুঁজে পায় কেয়া ও মৌরি। তারা দু জনে দ্বিতীয় বিভাগে পাস করেছে। পাসের আনন্দে মুখে হাসি আসলেও মনের হাসি হাসতে পারছে না। এবার লিজার রোল মেলাতে গিয়ে দেখে ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে লিজা। খুবই আনন্দিত দু’জন। লিজার ভালো রেজাল্টে কলেজের শিক্ষকরাও বেশ আনন্দ বোধ করছে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারছে না। কয়েকজন তো বলেই দিলেন এত ভালো রেজাল্ট অথচ মেয়েটা কী ভুল পথে পা দিয়েছে। নষ্ট হয়ে গেছে মেয়েটা। এমন মেয়েকে নিয়ে কোনো বাবা-মাই স্বপ্ন দেখবে না।

এসব কথা শুনেও না শোনার ভান করে মৌরি ও কেয়া। কেয়াকে ডাক দিয়ে মৌরি বলে, চল আমরা হাসপাতালে যাই। ওর পাসের খবরটা দেই। এত বড় খবর শোনার পর হয়তো কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। রিকশায় বসে দুজনেই রওয়ানা দেন হাসপাতালে। রিকশায় ওটার পর দুজনের মধ্যে কোনো কথা নেই। দুজনেই নীরব। দুজনেই ভাবছে লিজার কথা। কত সাদাসিদে মেয়েটা । অথচ কোন ঝড়ে সবকিছু তছনছ হয়ে গেলো। যে লিজাকে নিয়ে বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, শিক্ষক-শিক্ষিকা গর্ববোধ করবে, সেই তাকে সবাই আজ ধিক্কার দিচ্ছে। এভাবে ভাবতে ভাবতে হাসপাতালের গেটে এসে দাঁড়ালো রিকশা। দুজনেই ওয়ার্ডের যায়। নির্ধারিত বেডে গিয়ে দেখে অন্য রোগী শুয়ে আছে। পাশে তার স্বজন। রোগীর শরীরে স্যালাইন চলছে। পাশে থাকা স্বজনের কাছে মৌরি জানতে চায়, এই বেডে যে রোগী ছিল সে কোথায়?

কোন জবাব দিতে পারেনি ওই রেগীর স্বজনরা। দুজনেই হেঁটে গেলেন নার্স রুমে। ডিউটিরত নার্স চেয়ারে নেই। অপেক্ষা করলো দুজন। কিছুক্ষণ পর ডিউটিরত নার্স চেয়ারে বসলেন। মৌরি জানতে চাইলো, ওই বেডের রোগী লিজা এখন কোথায়? বেডের নম্বর আর নাম শুনে থমকে গেলেন নার্স। জানতে চাইলেন লিজার আপনারা কী হন?
আমরা ওর বান্ধবী।
ওর বাবা-মা কেউ আসেনি।
না। তাদের জানানো হয়নি।
কেন?
লিজা একটু সুস্থ হলে তারপর ওদের পরিবারকে জানাবো। তাছাড়া ওর মা অনেক বড় রোগে আক্রান্ত। এ খবর জানলে আরও সমস্যা হতে পারে। শুনেছি ওর বাবা রিকশা চালান ঢাকায়।
কিন্তু লিজা তো আর সুস্থ হবে না।
চমকে ওঠে মৌরি-কেয়া। দুজন দুজনের দিকে তাকায়।
মৌরি নিজেকে আর সামলে রাখতে না পেয়ে নার্সকে ধমক দিয়ে বলে, এসব আজে বাজে কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না। লিজার জন্য অনেক বড় সুখবর নিয়ে এসেছি। ওকে তাড়াতাড়ি জানাতে হবে। বলুন লিজা কোথায়? মাথা নিচু করে নার্স বললেন, ভোরবেলায় লিজা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে। লিজা এখন লাশঘরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন

Don't Miss

  • All

সম্পাদক: রকিবুল হাসান

ই-মেইল: drrakibul@yahoo.com

©- All Right Reserved by Artobitto.com